ব্লগে ফিরে যান
ডক্টর.কেমন ব্লগ

কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক কেন বাড়ছে? তরুণদের হৃদরোগের কারণ

doctor.কেমন5 মিনিট পড়ুন
কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক কেন বাড়ছে? তরুণদের হৃদরোগের কারণ

কম বয়সেও হার্ট অ্যাটাক: কেন বাড়ছে ঝুঁকি এবং কীভাবে নিজেকে সুরক্ষিত রাখবেন?

একসময় হার্ট অ্যাটাককে শুধুমাত্র বয়স্ক মানুষের রোগ মনে করা হতো। কিন্তু বর্তমানে প্রায়ই দেখা যাচ্ছে, ৩০ বা ৪০ বছরের একজন মানুষও হঠাৎ হার্ট অ্যাтакকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

অনেকে মনে করেন এই ঝুঁকি শুধু অতিরিক্ত ওজনের মানুষের জন্য। বাস্তবতা হলো, বয়স কম হওয়া কিংবা দেখতে রোগা হওয়া সবসময় সুস্থ থাকার নিশ্চয়তা নয়।

অনেক সময় একজন মানুষের জাতীয় পরিচয়পত্রে বয়স ৩৫ হলেও তার রক্তনালীর বয়স ৫০ বছরের মানুষের মতো হতে পারে।

চিকন বা স্বাভাবিক ওজনের মানুষেরও কেন হার্ট অ্যাটাক হতে পারে?

অনেকেই ভাবেন, "আমি তো খুব বেশি মোটা নই, তাহলে আমার হার্টে ব্লক হবে কেন?"

এর অন্যতম কারণ হলো ভিসেরাল ফ্যাট (Visceral Fat)—যা পেটের ভেতরে জমে থাকা চর্বি। এই চর্বি বাইরে থেকে দেখা যায় না, তাই একজন মানুষ দেখতে স্বাভাবিক হলেও শরীরের ভেতরে বিপজ্জনক মাত্রার চর্বি জমে থাকতে পারে।

ভিসেরাল ফ্যাট ধীরে ধীরে যা করে:
  • ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স সৃষ্টি করে
  • ট্রাইগ্লিসারাইড বাড়ায়
  • ভালো কোলেস্টেরল (HDL) কমিয়ে দেয়
  • রক্তনালীর ক্ষতি করে

ফলে হার্ট অ্যাটাক হওয়ার আগ পর্যন্ত অনেকেই বুঝতেই পারেন না যে তারা ঝুঁকির মধ্যে ছিলেন।

ডায়াবেটিস ধরা পড়ার আগেই হৃদরোগ শুরু হতে পারে

অনেক তরুণ হার্ট অ্যাটাক রোগীর কখনো ডায়াবেটিস ধরা পড়েনি।

কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে তাদের শরীর সম্পূর্ণ সুস্থ ছিল।

ডায়াবেটিস শনাক্ত হওয়ার বহু বছর আগেই শরীরে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স শুরু হতে পারে। তখন রক্তের শর্বরা হয়তো স্বাভাবিক থাকে, কিন্তু রক্তনালীর ভেতরে ক্ষতির প্রক্রিয়া চলতেই থাকে।

অর্থাৎ একজন মানুষ নিজেকে সুস্থ ভাবলেও তার ধমনীর ভেতরে চর্বি জমা হওয়ার কাজ নীরবে চলতে পারে।

দক্ষিণ এশিয়ার মানুষের ঝুঁকি কি বেশি?

গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশি, ভারতীয় এবং পাকিস্তানিদের মধ্যে তুলনামূলক কম বয়সে হৃদরোগ বেশি দেখা যায়।

সম্ভাব্য কারণগুলো হলো:

  • কম বয়সে ডায়াবেটিস হওয়ার প্রবণতা
  • পেটের ভেতরে বেশি চর্বি জমা হওয়া
  • জিনগত কারণ
  • উচ্চ ট্রাইগ্লিসারাইড
  • কম HDL কোলেস্টেরল

তাই যে ওজন একজন ইউরোপীয় মানুষের জন্য স্বাভাবিক বলে বিবেচিত হয়, একই ওজনের একজন বাংলাদেশির ক্ষেত্রে ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।

ঘুমের অভাব শুধু ক্লান্তি তৈরি করে না

অনেকেই প্রতিদিন মাত্র ৪-৫ ঘণ্টা ঘুমিয়ে দিনের কাজ চালিয়ে যান।

কিন্তু দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরে স্ট্রেস হরমোন বৃদ্ধি পায়, রক্তচাপ বাড়ে, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বৃদ্ধি পায় এবং প্রদাহজনিত পরিবর্তন দেখা দেয়।

ধূমপান ও ডায়াবেটিস: একটি বিপজ্জনক সমন্বয়

ধূমপান রক্তনালীর ভেতরের আবরণকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

ডায়াবেটিসও একই রক্তনালীকে দুর্বল করে দেয়।

যখন এই দুটি সমস্যা একসাথে থাকে, তখন ক্ষতির গতি শুধু যোগ হয় না, বরং অনেক গুণ বেড়ে যায়। ফলে কম বয়সেই ধমনীর ভেতরে ব্লক তৈরি হওয়ার ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

জিম করা মানুষও হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হন কেন?

অনেকেই মনে করেন নিয়মিত জিম করলে বা খেলাধুলা করলে হৃদরোগের ঝুঁকি থাকে না।

বাস্তবে বিষয়টি এতটা সরল নয়। বাহ্যিক ফিটনেস সবসময় হৃদপিণ্ডের সুস্থতার প্রতিচ্ছবি নয়।

কিছু মানুষের ক্ষেত্রে থাকতে পারে:

  • বংশগত উচ্চ কোলেস্টেরল
  • অজানা উচ্চ রক্তচাপ
  • অজানা ডায়াবেটিস
  • দীর্ঘদিনের ধূমপানের ইতিহাস
  • স্টেরয়েড ব্যবহারের ইতিহাস

ফলে দেখতে সুস্থ হলেও তারা ঝুঁকির বাইরে নাও থাকতে পারেন।

হার্ট অ্যাটাক কি সত্যিই হঠাৎ হয়?

আপাতদৃষ্টিতে হার্ট অ্যাটাককে "হঠাৎ" ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনা মনে হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি বহু বছরের একটি নীরব প্রক্রিয়ার শেষ পরিণতি।

ধমনীর ভেতরে বছরের পর বছর ধরে চর্বি জমে ব্লক তৈরি হতে থাকে, যা আমরা অনেক সময় টেরই পাই না।

হার্ট অ্যাটাকের আগের সম্ভাব্য সতর্ক সংকেত:
  • জোরে হাঁটলে বা সিঁড়ি ভাঙলে বুকে ভারী চাপ অনুভব হওয়া
  • সামান্য পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক ক্লান্তি বা শ্বাসকষ্ট
  • বিশ্রাম নিলে বুকের অস্বস্তি কমে যাওয়া

তরুণ বয়সের কারণে অনেকেই এসব উপসর্গকে গ্যাসের সমস্যা বা সাধারণ ক্লান্তি ভেবে অবহেলা করেন। ফলে প্রথম বড় লক্ষণ হিসেবেই হার্ট অ্যাটাক ধরা পড়ে।

বায়ুদূষণও কি দায়ী?

ঢাকার মতো শহরে বায়ুদূষণ একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত ঝুঁকির কারণ।

অতি সূক্ষ্ম ধূলিকণা (PM2.5) ফুসফুসের মাধ্যমে শরীরে প্রবেশ করে প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং রক্তনালীর ক্ষতি করতে পারে।

দীর্ঘমেয়াদে এটি হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে।

উপসংহার: জীবন আপনার, সিদ্ধান্তও আপনার

কম বয়সে হার্ট অ্যাটাক শুধু একটি রোগ নয়, বরং শরীর ও মনের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চলা অবহেলা এক চরম বহিঃপ্রকাশ।

অনিয়মিত ঘুম, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং বায়ুদূষণের এই সময়ে ৩৫ বছরের একজন মানুষের ধমনী কখন ৫৫ বছরের মানুষের মতো ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যাচ্ছে, তা বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই।

ফিটনেস মানে শুধু বাইরে থেকে সুন্দর দেখানো নয়; প্রকৃত ফিটনেস হলো শরীরের ভেতরের সুস্থতা।

তাই "আমার বয়স তো কম" ভেবে অবহেলা না করে শরীরের সতর্ক সংকেতগুলো গুরুত্ব দিন, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা করুন এবং আজই ধূমপান বর্জন, পর্যাপ্ত ঘুম ও স্বাস্থ্যকর জীবনযাত্রা অনুসরণ করুন।

প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই সর্বদা উত্তম।

লিখেছেন

doctor.কেমন

একটি বিশ্বস্ত ও জবাবদিহিমূলক স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়তে আপনার মতামত গুরুত্বপূর্ণ।

ডাক্তার খুঁজুন